৩ মাসে সরকারের বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১৬২ কোটি ডলার

দেশের বিদেশি
ঋণ বেড়েই চলেছে। বিশেষত সরকারি খাতে এ ঋণ দ্রুত বাড়ছে। হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে
বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণ বেড়েছিল ৮০ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকারের ঋণই বাড়ে
৬১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। আর চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর (প্রথম প্রান্তিকে) সরকারের
বিদেশি ঋণ বেড়েছে এক দশমিক ৬২ বিলিয়ন (১৬২ কোটি) ডলার। যদিও এ সময় বেসরকারি খাতের বিদেশি
ঋণ হ্রাস পেয়েছে ৬৫ কোটি ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের
গতকাল প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, গত বছর সেপ্টেম্বর
শেষে মোট বিদেশি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। যদিও জুন শেষে এর পরিমাণ
ছিল ১০৩ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বও সময়ে দেশে বিদেশি ঋণ বেড়েছে
৯৭ কোটি ডলার। এর আগে মার্চ শেষে দেশে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৯৮ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার
এবং ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১০০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ই প্রথম বিদেশি
ঋণ ১০০ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে। আর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দেশে বিদেশি ঋণের
স্থিতি ছিল ৯৬ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুন শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৮২ দশমিক
৮৩ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। আর জুন
শেষে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ২০ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, যা সেপ্টেম্বর
শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সরকারি খাতে বিদেশি ঋণ ১৬২ কোটি
ডলার বাড়লেও বেসরকারি খাতে তা ৬৫ কোটি ডলার হ্রাস পেয়েছে।
সরকারি খাতের
মধ্যে সরকারের নিজস্ব বিদেশি ঋণ রয়েছে ৭৩ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার এবং সরকারি বিভিন্ন
সংস্থার ঋণ ১১ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। সরকারের ঋণের পুরোটাই দীর্ঘমেয়াদি। তবে সরকারি
বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ৯ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার দীর্ঘমেয়াদি ও এক দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার
স্বল্পমেয়াদি ঋণ। আর বেসরকারি খাতের ঋণের মধ্যে ৯ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার দীর্ঘমেয়াদি
ও ১০ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার স্বল্পমেয়াদি ঋণ। সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ডে ধীরগতি দেখা দেয়। জুলাই মাসজুড়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন, আগস্টে হাসিনার পতন
ও অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পরও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসেনি। সরকারের উন্নয়ন
প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি অনেক কমে গেছে। এসব কারণে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি
ঋণ ছাড়ে গতি তুলনামূলক কম ছিল। তবে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিদেশি ঋণ দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ
করে হাসিনার তৃতীয় মেয়াদে (২০১৯-২০২৩ সাল) পাঁচ বছরে বিদেশি ঋণ সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি
পেয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৮ সাল শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ দশমিক
১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দায়িত্ব নেয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট
সরকার। পরের পাঁচ বছরে সরকারের বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পায় ৬ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। এতে
২০১৩ সাল শেষে সরকারের বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার।
এর পরের পাঁচ বছরে (২০১৪-২০১৮ সাল) সরকারের বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পায় ১৬ দশমিক ৮২ বিলিয়ন
ডলার। এতে ২০১৮ সাল শেষে সরকারের বিদেশি ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় ৪৪ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
আর আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের পাঁচ বছরে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন
ডলার। এতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি বৃদ্ধি পেয়ে
দাঁড়িয়েছে ৭৯ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।
এ পাঁচ বছরের
মধ্যে ২০১৯ সালে বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে বৃদ্ধি
পেয়েছে ৮ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০২১ সালে তা
বৃদ্ধি পেয়েছে ৯ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ২০২২ সালে
সরকারের বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার ও ২০২৩ সালে বেড়েছে সাত দশমিক
১১ বিলিয়ন ডলার, যা তৃতীয় সর্বোচ্চ। গত বছর ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সরকারের বিদেশি
ঋণ বেড়েছে তিন দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। তবে ৯ মাসে জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) এ ঋণ বেড়েছে
পাঁচ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে ২০০৯
সালের শুরুতে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১৩ সাল
শেষে তা দুই দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার বেড়ে দাঁড়ায় চার দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সাল
শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ স্থিতি ছিল ১২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০১৪ থেকে ২০১৮
সালের মধ্যে পাঁচ বছরে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ বেড়েছে আট দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার।
২০২৩ সাল শেষে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ
শেষ পাঁচ বছরে এ খাতে বিদেশি ঋণ বাড়ে আট দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। তবে গত বছর ৯ মাসে
(জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) এ ঋণ কমেছে এক দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার।








