জনপ্রশাসন সংস্কারের নিরলস যোদ্ধা

আমার শিক্ষক, জনপ্রশাসনে অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত প্রফেসর মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের ৯৩তম জন্মদিন আজ। ১৯৩৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি মাদারীপুরের কালকিনির সাহেবরামপুর গ্রামের মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন শেষে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান যদিও ১৯৫৮ সালে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, সেখানেই গণ্ডিবদ্ধ থাকেননি। প্রায় অর্ধশতাব্দীর অধ্যাপনা জীবনে তিনি ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ ও আনন্দ মোহন কলেজ, বরিশাল বিএম কলেজ, রংপুর কারমাইকেল কলেজ, ঢাকার জগন্নাথ কলেজ, টাঙ্গাইল সা’দত কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, মাদারীপুর সরকারি কলেজ, নরসিংদী সরকারি কলেজে বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যক্ষ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, লেখক, কবি, সম্পাদকসহ সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত করে গণমুখী জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠায় অর্ধশতাব্দীর বেশি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণামূলক প্রস্তাব বিভিন্ন সরকারের আমলে গৃহীতও হয়েছে।

প্রফেসর আসাদুজ্জামানের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাঠামো: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ এবং আত্মজীবনী ‘কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি’। প্রশাসনিক ক্যাডার বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে তাঁর একটি প্রবন্ধ ১৯৮০ সালে সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকায় প্রচ্ছদ প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়। তিনি এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন, সমপ্রতিভার প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা কীভাবে সমমেধার অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাকে অধীন করে রাখেন। শিক্ষা, কৃষি বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব কেন একজন অধ্যাপক, কৃষিবিদ বা চিকিৎসক হতে পারবেন না– এ প্রশ্ন তিনিই প্রথম তুলেছিলেন। ওই প্রবন্ধে বিপুল চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পেশাভিত্তিক ২৪টি ক্যাডার সৃষ্টি করেন। জনপ্রশাসনে অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৭ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয়। নব্বই অতিক্রান্ত বয়সেও তিনি আক্ষেপ করেন প্রশাসন সংস্কার না হওয়ায়।

বৈষম্যমুক্ত ক্যাডার সার্ভিস প্রতিষ্ঠার উপায় প্রসঙ্গে অধ্যাপক আসাদুজ্জামান বিভিন্ন সময়ে সরকারের করণীয় সম্পর্কে বলেছেন ও লিখেছেন। তাঁর মতে, সিভিল সার্ভিস অ্যাডমিন ক্যাডারকে পুনরায় যথাস্থানে– সিভিল সার্ভিস (ল্যান্ড) প্রত্যাবর্তনই একমাত্র সমাধান। পাকিস্তান আমলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানই পার্বত্য জেলায় ‘আনরুলি ডিস্ট্রিক্ট’ নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিসি নিয়োগ বিধান চালু করেছিলেন। তাহলে সব জেলাই কি এখনও আনরুলি? উল্লেখ্য, এখানেই তারা কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখন বিচারিক ক্ষমতা না থাকার কারণে তারা শুধু কালেক্টর, জয়েন্ট কালেক্টর, ডেপুটি কালেক্টর ইত্যাদি রূপে কর্মরত থাকবেন। কাজেই এটুকু সংস্কার হলেই বিষয়ভিত্তিক সৃষ্ট ক্যাডার সার্ভিস তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ফিরে পাবে।
এ দেশে প্রফেসর আসাদুজ্জামানের চেয়ে নামিদামি শিক্ষাবিদের অভাব নেই; কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার স্থলে জনগণের ক্ষমতায়ন এবং স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি যৌক্তিক বৈষম্যহীন প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে তিনি অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস নিয়ে যেভাবে সংগ্রাম করেছেন এবং এখনও সক্রিয়, তার দৃষ্টান্ত বিরল। নবতিপর বয়সেও নিরন্তর জনকল্যাণ এবং বাংলাদেশের প্রশাসন সংস্কারে তিনি লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন।
জন্মদিনে আমার এই গুণী শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তিনি সুস্থভাবে বেঁচে থাকবেন এই শুভকামনা।