বাড্ডা-রামপুরায় ৪ দিন যা ঘটেছে

১৮ই জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার প্রধান সড়ক প্রায় যানবাহন শূন্য। গুটিকয়েক রিকশা মাঝে-মধ্যে সিএনজি চালিত অটোরিকশার উপস্থিতি। স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ছুটাছুটি, তড়িঘড়ি ভাব। এমন সময় খবর আসে মেরুল বাড্ডার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে পুলিশের। কয়েকজন জানালেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর গুলি, টিয়ারশেল ছুড়ছে পুলিশ। উত্তর বাড্ডা থেকে মেরুল রিকশায় যেতে দশ মিনিট। ততক্ষণে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, যেন এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একপাশ থেকে পুলিশের টিয়ারশেল। অপর পাশ থেকে ইটপাটকেল ছুড়ে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করছিলেন শিক্ষার্থীরা।
পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গের চেষ্টা করছে কিন্তু শিক্ষার্থীরা অনেকটা অনঢ় ছিল স্থান পরিবর্তনের ব্যাপারে।
সরজমিন দেখা যায়, শুধু ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বৃহস্পতিবার কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে বাড্ডা-রামপুরার সড়কটিতে নেমে আসেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। জানা যায় এদিন সকাল ৯টা থেকে সড়ক অবরোধ করেন তারা। এক পর্যায়ে বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের সরাতে ধাওয়া দেয় পুলিশ। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। পরবর্তীতে টিয়ারশেল ও ছররা গুলি ছোড়া শুরু করেন তারা। এতে ঘটনাস্থলেই আহত হন অনেক শিক্ষার্থী। একের পর এক শিক্ষার্থী আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন স্থানীয় এইমস হসপিটালে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশের ধাওয়া, লাঠিপেটা এবং গুলিতে আহত তারা। মেরুল বাড্ডা থেকে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করতে করতে ৩০ থেকে ৪০ জনের পুলিশের একটি দল যায় মধ্যবাড্ডার ইউলুপের গোড়া পর্যন্ত। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দু’দিক থেকে তাদের ঘিরে ফেলে। সে সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ তাদের আক্রমণের শিকারও হয়েছেন। এ সময় পরিস্থিতি বুঝে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে তারা আশ্রয় নেন ইউলুপ সংলগ্ন কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি ভবনে। তারপরও দমে যাননি পুলিশ সদস্যরা। ওই ভবনের ভেতরে বসেই শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ছররা গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়তে থাকেন তারা। শিক্ষার্থীরাও পাল্টা প্রতিরোধ করে পুলিশের উদ্দেশ্যে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী যেমন আহত হয়েছেন অন্যদিকে পুলিশ সদস্যরাও আহত হন। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভবনে আটক থাকার পর বিকাল তিনটার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে তাদের ওই ভবনের ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয়।
দুপুর ১টা। তখন একাধিক শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে জানান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তবে নাম- পরিচয় তখনও কেউ বলতে পারেন নি। কিছুক্ষণ পর আরও কয়েকজন জানান চলমান সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন এক গাড়ি চালক। দুই মৃত্যুর খবরে আরও উত্তাল হয়ে ওঠে বাড্ডা-রামপুরা সড়ক। বেলা যত বাড়তে থাকে ততই শিক্ষার্থীরা জড়ো হন সড়কে। চারপাশ থেকে সাধারণ মানুষও তাদের পাশে থেকে সমর্থন দিচ্ছিলেন। মুহূর্তেই দেখা সড়কটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের স্লোগান স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে গোটা এলাকা। থমথমে পরিস্থিতি। পুলিশ সদস্যরা আরও মারমুখী হয়ে উঠেন। সোয়া একটার দিকে পুলিশ ফের ধাওয়া শুরু করে। শিক্ষার্থীদের ওপর মুহুর্মুহু টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে। কিছু সময় ছত্রভঙ্গ এলোমেলো অবস্থা হলেও শিক্ষার্থীরা ছুটে যান আবার সড়কে।
বেলা দুইটার দিকে আফতাব নগরের ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির অন্তত এক হাজার শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করেছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে লাঠি। জানতে চাইলে তারা বলেন, আমাদের হাতে লাঠি নিতে সরকার বাধ্য করেছে। সরকারের ছাত্রলীগ নামক পেটোয়া বাহিনী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেরেছে। পুলিশ দিয়ে বেধড়ক পেটাছে। এর প্রতিবাদে লাঠি হাতে নিয়েছি। কাউকে মারার উদ্দেশ্যে নয়, মারতে এলে প্রতিরোধ গড়ার জন্য এই লাঠি হাতে উঠেছে। এ সময় গণমাধ্যমকর্মীদের ওপরও ক্ষোভ ঝাড়েন শিক্ষার্থীরা। তারা আরও বলেন, দেশের কয়েকটি টিভি চ্যানেল যেকোনো আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। ফুটেজ নিয়ে যায় এক, আর রিপোর্টে বলে আরেক। তাদেরও ছাড় দেবো না।
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনের সড়ক থেকে একটু এগুলেই রামপুরা খালের সঙ্গে বনশ্রীর সংযোগ সাঁকো। এই সাঁকো পার হতেই দেখা যায়, বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ডি ব্লকের মোড় অবরোধ করেছে। শুধু তাই নয়, বনশ্রীর ডি ব্লক থেকে রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত পুরো সড়কটি শিক্ষার্থীদের দখলে। ব্রিজে উঠতেই রয়েছে সহকারী পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেলা ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিলে সেখানকার পুলিশের একটি দল তাদের নিবৃত করতে চেষ্টা চালান। বিনা উস্কানিতেই টিয়ারশেল ছোড়া শুরু করেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সহকারী পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ড ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
বেলা আড়াইটার দিকে রামপুরা ইউলুপের গোড়ায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের চার নম্বর ফটক দিয়ে পুলিশের একটি দল ভেতর থেকে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ সময় সেখান থেকে টিয়ারশেলের শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিরোধ করেন। এ সময় টিভি ভবনের ভেতরে কিছু শিক্ষার্থী ঢুকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে যান। সংঘর্ষ চলাকালে টিভি ভবনের ভেতরে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়ি ও মোটরসাইকেলে অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সংঘর্ষ চলাকালে ইম্পিরিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার খবর চাওর হয়। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হতে যাওয়া হয় সেই শিক্ষার্থীর বাসায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশের গুলিতে আহত অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীকে স্থানীয় নাগরিক হাসপাতালে নেয়া হলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। নাগরিক হাসপাতালের বিপরীত পাশের গলিতেই নিহত সেই শিক্ষার্থীর বাসা। সেখানে গিয়ে জানা যায়, তার নাম জিল্লুর রহমান। বাবার নাম মো. হাসান।
জিল্লুর রহমানের বাসা থেকে রাস্তায় ফিরতেই দেখা গেল আবারো সংঘর্ষ শুরু হয়েছে রামপুরা মোল্লা টাওয়ারের সামনে। বিকাল তিনটার দিকে ওই শপিং মলের সামনে পুলিশের একটি দল টিয়ারশেল ছোড়া শুরু করলে শিক্ষার্থীরা তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেন। এ সময় ব্যাপক মারধরের শিকার হন পুলিশের কয়েক সদস্য। এক পর্যায়ে তাদের ধাওয়া দিলে মহানগর প্রজেক্টের দিকে পালিয়ে যান। বিকাল চারটা নাগাদ পরিস্থিতি আরও থমথমে হয়ে ওঠে যখন রামপুরা ব্রিজের দিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি দল টিয়ারশেল ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসে। শুরুর দিকে শিক্ষার্থীরা তাদের সমীহ করলেও পরে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে ত্রিশ জনের মতো একটি বিজিবি সদস্যের দল তখন যেন অসহায় হয়ে পড়ে। এ সময় উপরে থাকা র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া শুরু হয়েছে টিয়ারশেল। কিন্তু তাতেও দমে যাননি শিক্ষার্থীরা। মারমুখী অবস্থান নিয়ে তেড়ে আসেন বিজিবি সদস্যদের দিকে। অবশ্য একটা পর্যায়ে উত্তেজনা খানিকটা পশমিত হয়। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হলো বিজিবিকে আক্রমণ করা হবে না। বিজিবি’র সদস্যদের নেতৃত্বদানকারী একজন তখন মাইকে ঘোষণা করেন উপর থেকে আর কোনো টিয়ারশেল ছোড়া হবে না। পরে তারা শিক্ষার্থীদের কথামতো নিচে বসে পড়েন। এমনই উত্তেজনার মধ্যে বিজিবি’র সদস্যরা নিরাপদে ওই স্থান ত্যাগ করেন। সন্ধ্যা পৌনে সাতটা। অনেক শিক্ষার্থীই ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। সড়ক অবরোধও তুলে নেন। এরই মধ্যে কিছু মানুষ বাংলাদেশ টেলিভিশনের দুটি ফটক ভাঙা শুরু করে। তারা শিক্ষার্থী কিনা বোঝা যায়নি। ফটক ভেঙে মুহূর্তে বিটিভি ভবন ভাঙচুর শুরু হয়। একপর্যায়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সে সময় বন্ধ হয়ে যায় বিটিভি’র ঢাকা কেন্দ্রের সম্প্রচার। টিভি ভবনের চারপাশ থেকে শুধু ভাঙার শব্দ আর ধোঁয়ার গন্ধ। টানা এক ঘণ্টা চলে এই তাণ্ডবলীলা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাত সাড়ে আটটার দিকে ঘটনাস্থলে আসে বিজিবি’র আরেকটি দল। এবার মুহুর্মুহু গুলি। চারপাশ থেকে একযোগে অ্যাকশন শুরু করে বিজিবি’র ওই দলটি। তাদের ছোড়া গুলিতে পরিস্থিতি রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকে। রাত দশটার দিকে রামপুরা ত্যাগ করে বাড্ডার দিকে যেতে চোখে পড়ে, শুধুই তাণ্ডবলীলা। মেরুল বাড্ডা থেকে উত্তর বাড্ডা পর্যন্ত পুরো সড়কটির রোড ডিভাইডার উপড়ে ফেলা হয়েছে, কিছুদূর এগুতেই বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় সড়কের উপর আগুন জ্বালাতে দেখা যায়।
১৯শে জুলাই শুক্রবার। সকালে দেখা যায়, বাড্ডা থেকে রামপুরা পর্যন্ত পুরো সড়কটিতে সাধারণ মানুষের অবস্থান। আর সড়কে ক্ষতচিহ্ন। গাছ উপড়ে সড়কের উপর ফেলে রাখা, রোড ডিভাইডার দিয়ে রাস্তা আটকানো। যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে পুরো প্রগতি সরণি। এদিন সকাল সাতটা থেকেই সড়কে অবস্থান নেন সাধারণ মানুষ। বেলা বাড়তেই শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন তাতে। উত্তর বাড্ডা, মধ্যবাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, আফতাবনগর, বনশ্রীসহ আশপাশের সব সড়কে ছিল মানুষের অবস্থান। সড়ক আটকে সকাল থেকেই শুরু হয় বিক্ষোভ। এ সময় বেশকিছু সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
সরজমিন দেখা যায়, সকাল দশটার দিকে মেরুল বাড্ডায় অবস্থান করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এসময় সড়কের উপর ডিভাইডার ফেলে বিক্ষোভ করছিলেন। তাদের ভাষ্য, আগের দিন শিক্ষার্থী আন্দোলনে সেই এলাকার কয়েকজনের নিহতের ঘটনার প্রতিবাদে সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। এ ছাড়া তাদের মধ্য থেকে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের নানা অনিয়মের প্রতিবাদেও স্লোগান দেন। তবে দিনভর সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বিক্ষোভকারীদের সড়ক থেকে উচ্ছেদের জন্য সারাদিনই চেষ্টা চালিয়েছেন তারা। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও বিজিবি’র গুলির পরও অবস্থান ত্যাগ করেননি বিক্ষোভকারীরা। গুলি ছোড়ার পর ক্ষণিক সময়ের জন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও কিছুক্ষণের মধ্যেই জড়ো হয়ে ইটপাটকেল ছুড়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশ্যে।
সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রামপুরা ব্রিজের দুই প্রান্ত ও বিভিন্ন দিকে কয়েক ভাগে অবস্থান নেন। পুলিশ ও বিজিবি’র সদস্যদের একভাগ অবস্থান নেন রামপুরা ব্রিজের মেরুলের অংশে। আরেকটি দল অবস্থান নেয় আফতাবনগরের জহুরুল ইসলাম সিটির ফটকে। অন্য একটি দল বনশ্রীর অংশে এবং টেলিভিশন ভবনের প্রথম ফটকে অবস্থান নেয়। এ সময় প্রতিটি দলকেই লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। অপরদিকে পুলিশ ও বিজিবি’র সদস্যরা তাদের প্রতিরোধে কখনো কাঁদানে গ্যাস, কখনো গুলি ছুড়তে থাকেন। কিন্তু কিছুতেই তাদের সড়ক থেকে সরানো যায়নি। বরং জুমার নামাজের পর পর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়। এ সময় রামপুরা ব্রিজের ঢালে অবস্থিত আনসার ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগ করেছেন বিক্ষোভকারীরা। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের একটি ভবনেও আগুন দেন তারা।
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে বনশ্রীর আবাসিক এলাকার ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। জানা গেছে, বনশ্রী এ, বি ও সি ব্লকের প্রতিটি সড়কে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী অবস্থান নেন। এ সময় বিজিবি’র সদস্যরা গুলি করতে থাকেন। ২০শে জুলাই শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে দেশ জুড়ে কারফিউ জারি করা হয়। নামানো হয় সেনাবাহিনী। আগের দিন শুক্রবার রাজপথে যে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিয়েছিল শনিবারও তারা সড়কে নেমে এসে বিক্ষোভ করেন। এদিন পুলিশ বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি সেনা সদস্যদেরও ওই এলাকায় টহল দিতে দেখা যায়। সরজমিন দেখা যায়, সকাল নয়টার দিকে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার প্রধান সড়কের দুই পাশে হাজারো মানুষ অবস্থান নেন। কিছুদূর এগিয়ে হোসেন মার্কেট এলাকার সড়কে আগুনের দৃশ্যের দেখা মেলে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকাল নয়টায় একটি মাইক্রোবাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তারা আরও জানান, মাইক্রোবাসটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহৃত।
সকালের ওই কাছাকাছি সময়ে মধ্যবাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, আফতাবনগর এলাকাতেও প্রধান সড়কে বিপুল সংখ্যক মানুষের অবস্থান দেখা গেছে। তবে বেলা বাড়তেই এসব এলাকায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে উত্তর বাড্ডায় ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
বেলা ১টার দিকে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়া হয় বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে। টানা গুলি ছোড়া অব্যাহত রেখে রামপুরা বাজার, ওয়াপদা রোড ও হাজীপাড়ার দিকে এগিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দলটি। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সড়ক থেকে সরে রামপুরা বাজারের গলি ও উলন রোডের দিকে চলে যান। তবে আভিযানিক দলটি আগের জায়গায় ফিরে এলে বিক্ষোভকারীরা আবারো সড়কে অবস্থান নেন। সারাদিনের এই চিত্র সন্ধ্যা পর্যন্তও দেখা যায়। তবে রাতে তারা পথ ছেড়ে দিলেও পরদিন রোববার আর সড়কে অবস্থান নেননি। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে রামপুরা থেকে বাড্ডার এই সড়কটির আগের পরিস্থিতি বেশ পরিবর্তন হয়। সড়কে অবস্থান নিয়ে কাউকে আন্দোলন কিংবা বিক্ষোভ করতে দেয়া হয়নি। একই পরিস্থিতি বিরাজ করে সোমবারও। এদিন পুরো সড়কই ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।








