সুবর্ণচরে মহিষ খামারে সোনালি সম্ভাবনা

নোয়াখালীর দক্ষিণে মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে একসময় ছিল বিশাল গোচারণভূমি। রাখালরা সেই চরে মহিষ ছেড়ে দিতেন। চরগুলো ভাটায় জেগে ওঠে, জোয়ারে ডুবে যায়। ভাটার সঙ্গে জেগে ওঠে সবুজ ঘাস। পলিমাখা সেই ঘাস খেয়ে পেট জুড়াত মহিষের দল। বিশাল এলাকাজুড়ে ছিল মহিষের বাথান (গোচারণভূমি বা আবাসস্থল)। একেকটি বাথান থেকে দিনে উৎপাদন হতো কয়েক টন দুধ। সেই দুধের ঘি আর দইয়ের খ্যাতি ছিল দেশজোড়া। সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই। উন্নয়ন প্রকল্প আর ঘরবাড়িতে চরাঞ্চলে এখন আর খালি জায়গা নেই। ফলে বিলুপ্ত হতে চলেছে চরের ঐতিহ্য। নোনাজলে দাপিয়ে বেড়ানো মহিষ এখন জায়গা করে নিয়েছে বসতবাড়ি কিংবা খামারে।
সুবর্ণচরে মহিষের খামার গড়ে তোলায় সোনালি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। মহিষ পালনের পাশাপাশি মহিষের তৈরি দুধের নানা রকম পণ্য তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। মহিষের পয়োবর্জ্যে তৈরি বায়োগ্যাস প্লান্টে হচ্ছে রান্না। আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের প্রভাবে পাল্টে গেছে মহিষ খামারিদের জীবনধারা।
একসময় বাথানেই দেশি জাতের মহিষ পালন করতেন সুবর্ণচর উপজেলার চরমহিউদ্দিন গ্রামের আবদুল মালেক। সম্প্রতি সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি এনজিওর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নে তিনি নিজ বাড়িতেই পরিবেশসম্মতভাবে গড়ে তোলেন মহিষের খামার। এখন তাঁর ১০টি মহিষ আছে। দেশি জাতের তুলনায় মুররাহ্ মহিষে মিলছে বেশি দুধ ও মাংস। সুবর্ণচরের আলআমিন বাজার এলাকায় কয়েক বছর আগে গরুর খামার গড়ে তোলেন মেহরাজ উদ্দিন। গরু পালনে খরচ বেশি, লাভ কম। অন্যদিকে মহিষ পালনে তেমন পরিশ্রম নেই, খরচও কম। তাই গত বছর থেকে সাগরিকার সহায়তায় মুররাহ্ জাতের মহিষ পালন করছেন তিনি। এখন তাঁর খামারে আছে ১২টি মহিষ। একেকটি থেকে দৈনিক ১০-১২ লিটার দুধ পাওয়া যাচ্ছে। মেহরাজ তাঁর লাভের হিসাব তুলে ধরে বলেন, দেশি জাতের একটি মা মহিষ দেড় থেকে দুই কেজি দুধ দিলেও মুররাহ্ দিচ্ছে ১০-১২ কেজি; আবার ১৫-২৫ মণ পর্যন্ত মাংস হচ্ছে মুররাহ্ জাতে।
আবদুল মালেক ও মেহরাজের মতো সুবর্ণচরের প্রত্যন্ত গ্রামে এখন মহিষ খামার দিয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন বহু নারী-পুরুষ। এ উপজেলায় অন্তত ৪০টি খামার গড়ে উঠেছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ‘সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্ট’ (এসইপি) নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
সাগরিকার নির্বাহী পরিচালক সাইফুল ইসলাম সুমন বলেন, ২০২১ সালে গৃহীত প্রকল্পের মাধ্যমে ৮০০ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় উন্নত জাতের মহিষের প্রজনন খামার নির্মাণ করা হয়েছে। হাতিয়া ও সুবর্ণচরের দুটি বাজারে মহিষ ওঠা-নামার র্যাম্প, স্যানিটারি টয়লেট, ওজন নির্ণয় যন্ত্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পিট তৈরি করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের তৈরি দই ও ঘি বিএসটিআই সার্টিফিকেটের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। এ ছাড়া দুধ সরবরাহের জন্য অ্যালুমিনিয়ামের মিল্ক ক্যান বিতরণ করা হয়েছে। ৪০ জন উদ্যোক্তাকে আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে পরিবেশসম্মত মহিষের বাসস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রায় চার হাজার মহিষ ও গরুকে ভ্যাকসিন ও কৃমিনাশক দেওয়া হয়েছে। অনলাইন মার্কেটিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের ম্যানেজার মো. হাসনাইন বলেন, মহিষের পয়োবর্জ্য থেকে কেঁচো সার তৈরি করছেন উদ্যোক্তারা। প্রকল্প এলাকায় চারটি ব্র্যান্ড শপ স্থাপনের মাধ্যমে মহিষের দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। চারজন উদ্যোক্তা বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরি করেছেন। এতে তাদের প্রত্যেকের বছরে ২০ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬৯ জন ঘাস চাষ ও ঘাস প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। তাদের মাধ্যমে মাসে ১২০ টন ঘাস উৎপাদন হয়। ২৪ জন উদ্যোক্তাকে উন্নত জাতের মহিষ কেনার জন্য ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।








