ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট সংকট

রাজধানী ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা শহরগুলোতে টানা চার দিন ধরে বেশি ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। ফলে জ্বর হলেই অনেকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে ভিড় করছেন হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয়। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রয়োজনীয় কিট সংকট দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে বেসরকারিভাবে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য যেতে হচ্ছে রোগীদের। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, জুলাইয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর থেকেই এনএস ১ কিটের চাহিদা বেড়েছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী কিট মিলছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, ডেঙ্গু কিটের কোনো সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী সব হাসপাতালে কিট সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছেন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমানে দৈনিক তারা ২৫০ থেকে ৩০০ ডেঙ্গু পরীক্ষা করছে। বুধবার শেষে হাসপাতালে মাত্র ৪০০ কিট রেয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবার কিট শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান জানান, গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ৫ হাজার কিটের চাহিদা দেওয়া হয়। আজ বৃহস্পতিবার ২ হাজার ৭০০ কিট আসার কথা রয়েছে। যদি না আসে পরীক্ষা বন্ধ রাখতে হবে।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে দৈনিক গড়ে ২৫ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। অথচ ডেঙ্গু পরীক্ষায় বুধবার শেষে হাসপাতালে মাত্র ৫০টি কিট রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই সপ্তাহ আগে কিট চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তার উত্তর এখনও মেলেনি। দুই দিনের মধ্যে নতুন কিট না এলে পরীক্ষা বন্ধ রাখতে হবে। একই অবস্থা বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখানে ডেঙ্গু পরীক্ষা বাড়লেও কিট বরাদ্দ মেলেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ৩ হাজার কিটের চাহিদা পাঠানো হলেও তা পাওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয়ভাবে বেশি দামে কিট কিনতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের ঘাটতি নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয়ভাবে ভারতের বায়োটেক কোম্পানির তৈরি কিট কিনে পরীক্ষা চালু রেখেছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালে ৩৫০টি কিট ছিল। এ কিটগুলো আগে ৬৫ টাকায় কেনা হতো, তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় এখন দাম বেড়েছে। প্রতিটি কিট এখন ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অথচ পরীক্ষা বাবদ নেওয়া হচ্ছে রোগী প্রতি ৫০ টাকা করে। বাকি টাকা দিতে হচ্ছে ভর্তুকি। এক সপ্তাহের চাহিদা মজুত রেখে এ কিটগুলো কেনা হয় দুই-তিন দিন পরপর। এরই মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৩ হাজার কিটের চাহিদা দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে। দশ দিন আগে এই চাহিদা দেওয়া হলেও এখনও তা পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামের পর রোগী বেশি বরিশালে। শয্যার অভাবে শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের অস্থায়ী মেডিসিন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও অন্যান্য রোগী রাখা হচ্ছে একসঙ্গে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে; তবে পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। বিভাগের কোনো হাসপাতাল থেকে এখন পর্যন্ত কিট সংকটের অভিযোগ করা হয়নি। বরিশাল বিভাগে মোট ৮৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মারা গেছেন ১১ জন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিভাগের চার জেলা ছাড়াও গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের রোগীরাও এখানে ভর্তি হচ্ছেন। হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে গত ৩৩ দিনে মোট ভর্তি হয়েছেন ৬৫৬ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের। হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পার্সন ডা. ফরহাদ বিন হীরা বলেন, ৫৫ শয্যার ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ওয়ার্ড চালু থাকলেও তাতে রোগী ঠাঁই দেওয়া যাচ্ছে। ফলে ৫০ শয্যার আরও একটি ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি চলছে।
রাজশাহীতেও হাসপাতালগুলোয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জু বলেন, প্রতিটি মসজিদে ঈমাম সাহেব তাঁর বয়ানে সচেতন করছেন। জমে থাকা পানি পরিষ্কারে সচেতনতার পাশাপাশি অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হচ্ছে।
ঢাকার বাইরে কিট সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, অধিদপ্তরে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিটের সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে।
আরও ১২ জনের মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, আগের দিন সকাল ৮টা থেকে গতকাল একই সময় পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ২৭৩ জনে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিল ১০ জন। অর্থাৎ চলতি মাসের এই দুই দিনেই ২২ জন ডেঙ্গুতে প্রাণ হারাল। গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ২ হাজার ৭১১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ১৩০ জন ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি আছেন ১ হাজার ৫৮১ জন। সারাদেশে চলতি বছর মোট ৫৭ হাজার ১২৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যুরো, অফিস ও প্রতিনিধিরা।








